একইদিনে বিধবা মা-মে'য়ে, বাবা-স্বামীর মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি!

বাগেরহাটের শরণখোলার দক্ষিণ কদমতলা গ্রামের শোভা'রাণী সাধক (৬৫)। ১৯৭১সালে রাজাকাররা তার স্বামী মনিন্দ্র সাধককে ধরে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে কু‌‌'পিয়ে হ'ত্যা করে। একই সাথে তার বাবা মহানন্দ সমাদ্দারকেও হ'ত্যা করা হয়। একই দিনে বিধবা হন মা-মে'য়ে দুজনে। স্বামী আর বাবাকে মে'রে ফেলার খবর জানতে পেরে ভ'য়ে সবকিছু ফেলে পরিবারের সবাই পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে প্রা'ণে রক্ষা পান। পরে রাজাকাররা সমস্ত মালামাল লুটপাট করে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয় তাদের ঘরবাড়ি। মা মানকুমা'রী মা'রা গেছেন চার বছর আগে। স্বামী এবং বাবাকে নি'র্মমভাবে হ'ত্যার সেই স্মৃ'তি মনে করে আজও অশ্রু ফেলছেন শোভা'রাণী সাধক।

অশ্রুভেজা কণ্ঠে শোভা'রাণী জানান, সঠিক দিন-তারিখ মনে নেই। তবে আষাঢ় মাস তখন। এর আগেও কয়েকবার বাড়িতে হানা দিয়েছে স্থানীয় রাজাকাররা কিন্তু ধরতে পারেনি। ওইদিন সকালে রাজাকার আসছে শুনে বাড়ির পেছনের খালপাড়ের ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নেন তার স্বামী মনিন্দ্র সাধক। সেখান থেকে খুঁজে বের করে ধরে নিয়ে যায় তাকে। একই সময় রাজাকারদের আরেক দল তার বাবা মহানন্দ সমাদ্দারকেও বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে দুজনকে লাকুড়তলা বাজারে পুলের ওপর নিয়ে সকাল ১০টার দিকে প্রকাশ্যে জবাই করে খালে ফেলে দেয়।

শোভা'রানী জানান, রাজাকারদের এই হ'ত্যাণ্ডের খবর জানতে পেরে পার্শ্ববর্তী উত্তর তাফা'লবাড়ী গ্রামে তার স্বারমী এক মু'সলিম বন্ধু নৌকায় করে গো'পনে পরিবারের ১০-১২জনকে তাদের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেন। সেখানে এক রাত একদিন রাখার পর বগী গ্রামে দেবরের শ্বশুর সূর্য কির্তনিয়ার বাড়িতে পৌঁছে দেন। সেখানে একরাত থাকার পর বয়জদ্দিন মাঝির একটি বড় নৌকায় করে এলাকার ২০-২৫জনকে ভা'রতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ২৯দিন পর ভা'রতের হাসনাবাদ গিয়ে পৌঁছান। সেখানে দুই দিন ছিলেন তারা। পরে ঠাকুরনগর তাদের এক জ্ঞায়াতির (বংশের আত্মীয়) বাড়িতে প্রায় ১০মাস আশ্রিত হয়ে ছিলেন। ১১মাসের মা'থায় তারা ভা'রত থেকে দেশে ফিরে এসে আর কিছুই অবশিষ্ট পাননি।

শোভা'রাণী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমা'র স্বামী ও বাবাকে একই দিনে জবাই করে হ'ত্যা করল রাজাকাররা। একমাত্র মে'য়ে সরুবালার বয়স তখন আড়াই বছর। সেই সময় মাত্র ১৫বছর বয়সে বিধবা হলাম আমি। একদিনেই বিধবা করল আমাদের মা-মে'য়েকে। লুটপাট করে আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিল। অথচ তাদের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই। দেশ স্বাধীনের পর অনেকে সাধারণ মানুষও নাকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে শুনেছি। আমি সরকারের কাছে আমা'র স্বামী ও বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানাই।

শোভা'রাণীর একমাত্র মে'য়ে সরুবালা কা'ন্নাজ'ড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি বাবার আদর পাইনি। রাজাকাররা আমা'র মা এবং নানীকে একসাথে বিধবা বানিয়েছে। আমাদের সব সুখ-আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। নানী বেঁচে নেই। মায়ের অবস্থাও ভালো না। এই শেষ সময়ে আমা'র মা যেনো তার স্বামী ও বাবা শহীদের ম'র্যাদা না পেলেও অন্তত সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেন সেই দাবিটুকু জানাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে।

৯নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন সাবসেক্টরের যু'দ্ধকালীন ইয়াং অফিসার ও শরণখোলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার হেমায়েত উদ্দিন বাদশা বলেন, একাত্তরে রাজাকাররা দক্ষিণ কদমতলা, লাকুড়তলা ও রাজেস্বর গ্রামে গণহ'ত্যা চালিয়েছে। সেখানে ১০-১২জনকে গু'লি ও জবাই করে হ'ত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে অটলকুলু নামের একজনের পরিবার শহীদের স্বীকৃতি পেতে আবেদন করেছে। অন্যরাও আবেদন করলে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। শরণখোলা উপজে'লা নির্বাহী কর্মক'র্তা সরদার মোস্তফা শাহিন বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার আবেদন করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে।

Back to top button
error: Alert: Content is protected !!